
পেট্রলের লিটার ৬৪ টাকা! ফুল ট্যাঙ্কে হুলিয়ে লং ড্রাইভ
দেবাশিস দাশগুপ্ত : পেট্রলের আমদানি-রপ্তানি নিয়ে তীব্র কথা কাটাকাটি চলছে বিশ্ব জুড়ে, যার একদিকে আমেরিকা, অন্য দিকে ভারত, রাশিয়া, চিনের মতো দেশ। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়া যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকেই ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ থেকে সস্তায় তেল কিনছে ভারত আর তাতেই গাত্রদাহ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসেবে ভারতের উপর অতিরিক্ত ২৫% বাণিজ্য শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। এতে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সরাসরি বাণিজ্য যে বেশ কিছুটা বেসামাল অবস্থায় রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ভারতের সরকারি বয়ান, দেশের মানুষকে সস্তায় জ্বালানি সরবরাহ করাই মূল নীতি, ট্রাম্প যতই হুমকি দিন, সেই নীতি থেকে ভারত যে তার মিত্র দেশ রাশিয়ার পাশ থেকে সরে আসবে না, তা আপাতত স্পষ্ট করেছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।

গেলেফুর প্রবেশ তোরণ
কিন্তু, তেল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যুদ্ধে কোনও তাপ-উত্তাপই যেন নেই পশ্চিমবঙ্গ ও তার প্রতিবেশী রাজ্য অসমের তিন-চারটি প্রান্তিক জেলার। উত্তরবঙ্গে বানভাসীর জন্য যে রাষ্ট্রের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই ভুটান থেকেই জলের দরে পেট্রল কিনে রীতিমতো ব্যবসা করছেন এ রাজ্যের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, অসমের বঙাইগাঁও, চিরাং জেলার মানুষ।
ব্যাপারটা আসলে ঠিক কী? পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সীমান্তে রয়েছে ভুটানের দুটি শহর, যার একটি পর্যটকদের কাছে খুবই পরিচিত ফুন্টশোলিং ও অন্যটি চিরাং জেলা লাগোয়া ভুটানের গেলেফু শহর। গেলেফুর কথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বড় একটা না জানলেও আয়তন ও শহর হিসেবে সেটি ফুন্টশোলিংয়ের চেয়ে অনেকটাই বড়। এই শহরটিকে ভুটানের রাজা মাইন্ডফুলনেস সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন। আগামী দিনে এই শহরই হয়ে উঠবে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সঙ্গে ভুটানের বাণিজ্যের মূল দরজা।

ফুন্টশোলিংয়ের প্রবেশপথ
ফুন্টশোলিং ও গেলেফু, দুই শহরেই পেট্রলের দাম পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে এক লিটার পেট্রলের দাম ১০৫ টাকা, সেখানে অসমে দাম ৯৮ টাকা প্রতি লিটার। আর সেই পেট্রলেরই দাম ভুটানে মাত্র ৬৪ টাকা। ফলে এই দুই রাজ্যের বহু বাসিন্দাই সীমান্ত পেরিয়ে সস্তা দরে পেট্রল কিনে গাড়ি, মোটর বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করে ফিরে আসছেন। তারপর সস্তার তেলে গাড়িও ছুটছে আবার কেউ কেউ সেই তেল বোতলবন্দি করে বিক্রিও করছেন। অর্থাৎ যাকে বলে ডবল লাভ। আলিপুরদুয়ারের প্রবীণ এক পর্যটন ব্যবসায়ী বলছেন, ‘ফুন্টশোলিং থেকে অনেকেই তেল কিনে এনে বোতলে ভর্তি করে বিক্রি করছেন। তবে সেটা মূলত গ্রামের দিকেই হয়। এটা ওপেন সিক্রেট। ক্রেতা, বিক্রেতা, দু’তরফেরই লাভ বলে কেউ বিশেষ এ নিয়ে হই চই করেন না।’

গেলেফুর একটি পার্কে সপরিবার ভুটানের রাজা জিগমে খেসর নামগিয়াল
বঙাইগাঁওতে গাড়ি চালান অজয় পাশোয়ান। ৪৫ কিমি দূরে ভুটানের গেলেফু শহরে প্রায়ই তাঁকে যেতে হয়। সীমান্তে চেক ইন করে প্রথমেই তিনি তাঁর গাড়ির খালি ট্যাঙ্ক ভর্তি করিয়ে নেন। এত লাভ কেউ ছাড়ে? তাঁর কথায়, ‘আমরা ভুটান এলেই এখান থেকে তেল ভরিয়ে নিই। অনেক টাকা সাশ্রয় হয়। গতকাল ওখানে তেলের দাম ছিল ৬৩.৫৬ টাকা লিটার কিন্তু আজ দেখলাম দাম বেড়ে হয়েছে ৬৪ টাকা।’ বঙাইগাঁওতে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা ধনঞ্জয় দাসের। ভুটানের সস্তার পেট্রল নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের বাড়তি লাভ। এর জন্যে ট্যুরিস্টদেরও আমরা কিছুটা সস্তায় ঘোরাতে পারি।’

গেলেফু ও ফুন্টশোলিংয়ের পাম্প থেকেই গাড়িতে ভরা হয় পেট্রল
পুলিশ-প্রশাসনের বক্তব্যও খুব পরিষ্কার। প্রশাসনের কর্তাদের কথায়, ভিন দেশ থেকে তেল কিনে বিক্রি করা বা গাড়ি চালানো কতটা নিয়মবিরুদ্ধ তা নিয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট কোনও নির্দেশিকা নেই। যদি কেউ নির্দিষ্ট ভাবে অভিযোগ করেন আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। যদিও তাঁরা জানেন, এ নিয়ে কোনও অভিযোগ জমা পড়বে না কারণ যেচে সোনার হাঁস কেউ কাটতে যাবেই বা কেন?

ফুন্টশোলিং শহর
ফলে, চল পানসি ভুটান, ট্যাঙ্ক ফুল করে হুলিয়ে লং ড্রাইভে চালাও গাড়ি।
পেট্রল নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া যতই রেষারেষি আর কাজিয়ায় জড়াক না কেন, ভুটান থাকলে আবার চিন্তা কীসের।