
দেবাশিস ভট্টাচার্য : নির্বাচনে সিপিআইএম তথা বামফ্রন্ট একটিও সিট না পাওয়ার জন্য তারা বিধানসভায় শূন্য হয়ে যায়। তখন থেকে রাজ্যের শাসক দল ও অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কেন্দ্রের শাসক আরএসএস বিজেপির লাগাতার ব্যঙ্গ বিদ্রুপ উপহাস করে যায় সিপিআইএম ও তার সহযোগী দলগুলিকে নিয়ে।সবসময়ই তারা বলার চেষ্টা করে রাজ্যের রাজনীতিতে এই দলটি অর্থাৎ সিপিআইএম একদমই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে যাদের দূরবীন দিয়ে দেখতে হয়। গত কয়েক মাস পর্যন্ত এই ধারাটা বজায় ছিল। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে বা নির্বাচন প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়ে গেল তখন এই দুই দলের ভাষ্য বদলে গেল। সিপিআইএম কে শূন্য বলে যে উপহাস করা হচ্ছিল তা ক্রমশ কমতে লাগলো।

গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ইস্যুতে বামপন্থী দলগুলো তারা রাস্তায় নেমে যেভাবে আন্দোলন শুরু করেছে করেছিল তা সে ইনসাফ যাত্রাই হোক কি বাংলা বাঁচাও যাত্রা হোক তাদের যে সংগঠিত রূপ দেখা গেছে এবং সেটা যে আগামী নির্বাচনে একটা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে সেটা শাসক দল ও প্রধান বিরোধী দল বুঝতে পেরেছে। আর জি কর হাসপাতালের ঘটনা, শিক্ষক দের চাকরি নিয়ে দুর্নীতি, ক্রমবর্ধমান বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য, শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়ংকর অবনতির বিরুদ্ধে বাম দলগুলো সঙ্ঘবদ্ধ ও লাগাতার কার্যকরী আন্দোলন, যা সাধারন মানুষের মনের মধ্যে একটা সাড়া জাগিয়েছে।

বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন জরুরি ইসুতে রাস্তায় আন্দোলনে ব্যাপক সাড়া জাগানোর মধ্য দিয়ে সিপিআইএম যখন নির্বাচনী প্রচারে বৃহত্তর আঙিনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অভাবনীয় সারা পাচ্ছে দেখে তখন থেকেই তৃণমূল ও বিজেপি নেতাদের মুখে এদের শুধু শূন্য উচ্চারণ করা বন্ধ হয়ে গেল। তারা ভাবতে লাগলো যে এবার হয়তো এরা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, বেশ কিছু সংখ্যক সিট নিয়ে হয়তো বিধানসভায় যেতে পারে। তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলেরই নির্বাচনী প্রচারে সিপিআইএমের নাম বারে বারে শোনা যেতে লাগল, যেটা কিছুদিন আগে এদের দ্বিদলীয় রাজনীতিতে সিপিআইএমকে ধর্তব্যের মধ্যেই অনত না। এখন সিপিআইএম এই দুই দলের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার দেখা যাক এর পেছনে আর কি কি কারণ থাকতে পারে। আগামী ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, সংখ্যায় দুর্বল বা শূন্য অবস্থা থেকেও কেন সিপিআইএমকে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি গুরুত্ব দিচ্ছে বা ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অবশ্যই এর মধ্যে কিছু রাজনৈতিক কৌশল আছে। তারা জানে ভোট সমীকরণ একটা সম্ভাবনার খেলা। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে গ্রাম থেকে শহর বিভিন্ন পর্যায়ে সিপিআইএমের সংগঠন এখনো অনেকটাই আছে। কৃষক সংগঠন হোক সে শ্রমিক সংগঠন হোক মধ্যবিত্ত কর্মচারী সংগঠন হোক ছাত্র- যুবক শিক্ষক সব অংশেই সংগঠিত করার ক্ষমতা সিপিআইএমের তথা তাদের সংগঠনগুলোর আছে। বলা যেতে পারে তাদের ক্যাডার বেস এখনো ভালোভাবেই আছে। ভোটের শূন্য পেলেও রাস্তায় ঘাটে মাঠে সংগঠিত কর্মী থাকলে ঘুরে দাঁড়াবার সম্ভাবনা থাকে। গত বেশ কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে তাদের জমায়েত তাদের বিকল্প রাস্তা খোঁজার চেষ্টা তৃণমূল বিজেপিকে সতর্ক করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি এই দুই দলের মধ্যে লড়াই যা প্রচার মাধ্যমের সাধারণ মানুষের কাছে দেখানো হয় সেখানে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বাম দলগুলোর ভোট কাটার ক্ষেত্রে কি ভূমিকা নেবে! সেটা এই দুই দলকে ভাবিয়ে তুলেছে। বাম ভোট বাড়লে বিজেপির ক্ষতি হতে পারে, আবার কোথাও তৃণমূলের ক্ষতি হতে পারে তাই দুই পক্ষই চায় না সিপিএম হঠাৎ করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠুক। নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে যারা এবার নতুন ভোট দেবেন তাদের নিয়ে ও একটা চিন্তা রয়েছে। ছাত্র রাজনীতিতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন এই জায়গা গুলোতে বামপন্থী রাজনীতি এখনো অনেক সক্রিয়। রাজ্যের ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা, কর্মসংস্থানের কোন দিশা না থাকা নতুন ভোটারদের মধ্যে এই বিষয়গুলির প্রভাব পড়তে পারে। সিপিআইএমের ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠন এই বিষয়গুলিতে নতুন ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। ১৮ থেকে ২৫ বছরের ভোটারদের মধ্যে হঠাৎ বামপন্থীদের সমর্থন বাড়লে সেটা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।

শাসক দল বুঝেছে শুধু ভাতা দিয়েই সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করা যাবে না। গত কয়েক বছর ধরে শাসকদলের লাগামহীন দুর্নীতি ও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভূমিকা, ভোটারদের সামনে এক প্রশ্ন চিহ্ন এনে দিয়েছে। ক্লিন ইমেজ বা বিকল্প রাজনীতির দাবি অনেক ভোটার যারা তৃণমূল বা বিজেপির দুই দলেরই ওপর অসন্তুষ্ট তারা বিকল্প খুঁজছে। এই জায়গায় সিপিএম নিজেদের কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা নীতিগত দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। শাসক দল বুঝতে পারছে সরকার বিরোধী মনোভাব যদি বাড়ে বামেরা লাভ তুলতে পারে। বামেরা জোট করেছে আইএসএফ ও সি পি আই এম এল দলগুলির সাথে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, অভাব অভিযোগের থেকে রাজ্যের ধর্মীয় মেরুকরণ বিশেষ করে হিন্দু মুসলমান এই ধরনের সম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় মন্দির মসজিদ ইস্যুতে সাধারণ মানুষের চাহিদাগুলো পিছনে পড়ে গেছে। তাই ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াই হলে ফলাফল অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, সিপিআইএমের অনেক ইসু বিশেষ করে শ্রমিক অধিকার কৃষক আন্দোলন মূল্যবৃদ্ধি বেকার সমস্যা অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সমস্যা এই ইসুগুলো তৃণমূল কংগ্রেস তথা রাজ্যে শাসক দল কে ব্যাকফুটে ফেলতে পারে। শাসকরাই ভাষ্য তৈরি করে, তারা চায় তার বিরুদ্ধে যেন কেউ কথা না বলে, যারা বিরুদ্ধচারণ করে তারা পাগলাটে বলে পরিচিত করা এবং চেষ্টা করা হয় বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্যে বিশেষ করে সোশ্যাল মাধ্যমে যা এখন বিশদভাবে ব্যবহৃত তার সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে বিরোধীদের ভূমিকাকে গৌণ করে দেওয়া। ভয় দেখানো মিথ্যে মামলা দিয়ে ভীতির সঞ্চার করার চেষ্টা করা। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি ভালোভাবেই জানে যে বাম দল গুলোর প্রতিবাদের ভাষা জনগণের মধ্যে জাগরিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে এবং সংগঠিত ভাবেই এই কাজটা বিভিন্ন ইস্যুতে বামপন্থীরা আইনসভায় তথা আদালতের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। সিপিএম এখন ক্ষমতার দৌড়ে এগিয়ে না থাকলেও তাদের সংগঠনগুলোর রাস্তায় নেমে আন্দোলন,সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের প্রতিবাদ,বিকল্প রাজনীতির সন্ধান, ভোট কাটার ক্ষমতা তৃণমূল ও বিজেপিকে যথেষ্ট আশঙ্কিত করে তুলছে। তাই ২০২৬ এর নির্বাচনে সিপিআইএম তথা বাম ফ্রন্টের দলগুলি যে বিশেষ একটা ফ্যাক্টর হতে চলেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

২০২১ এর নির্বাচনে সি পি আই এম সিট না পেলেও যতই তারা শূন্য থাকুক রাজ্যের সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে তারা যে একটা ফ্যাক্টর এটা তৃণমূল ও বিজেপি দুটো দলই ভালোভাবে জানে। এদের দুই দলেরই একটা কমন এজেন্ডা যাতে কোনভাবেই সিপিআইএম প্রাসঙ্গিক না হয়ে পড়ে। এর জন্য যত রকমের সেটিং বা যাই করতে হোক না কেন এই দুটো দল করতে পিছপা হবে না।কারন এই দুই দলের নেতারাই জেনে গিয়েছে গরীব মেহনতি মানুষগুলোর জন্য লড়াই আন্দলোনের পথে একমাত্র রয়েছে বামেরাই। তাদের কমরেড-দের প্রাণের বিনিময়েও লড়াই বন্ধ হয়নি। বহু মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেবার পরেও মনোবল একটুও চিড় ধরেনি বাম কর্মী সমর্থকদের মনে। আর এজন্য ‘শূন্য’ এখন বড় ফ্যাক্টার হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল ও বিজেপির কাছে।

৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের পরে বাম এমন অবস্থাতেও আসতে পারে, কাউকে সরকার গড়তে তখন এই শূন্যের কাছেও হাত পাততে হতে পারে।