
প্রতিমা ভাঙা নয়, গড়েই আনন্দ পান বাংলাদেশের মৃৎশিল্পী ইসমাইল
দেবাশিস দাশগুপ্ত : পঞ্জিকা দেখার দরকার পড়ে না, প্রতিমা ভাঙার খবর প্রচারিত হলেই বোঝা যায় দুর্গাপুজো এসে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক একটি সংবাদমাধ্যমকে এমনই কটাক্ষ ছুড়ে দেন বাংলাদেশের এক হিন্দু যুবক। বাস্তবিক বিষয়টি অগ্রাহ্য করার মতো নয়ও। প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পালাবদলের বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইতিমধ্যেই মূর্তি ভাঙার খবর আসতে শুরু করেছে। দুর্গা প্রতিমা ভাঙার অভিযোগ এসেছে মাদারিহাট, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনার মতো এলাকা থেকে। মূর্তি ভাঙার কারণ নিয়ে পুলিশের যুক্তিও বেশ হাস্যকর। একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, খুব বৃষ্টি আর হাওয়া বইছিল। সম্ভবত হাওয়ার কারণেই ভেঙে গিয়েছে মূর্তিগুলো।

তবে মুদ্রার উলটো পিঠও রয়েছে। হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙার অভিযোগ যদি সে দেশের একটি দিক হয়, তবে অন্য দিকে রয়েছেন মুসলিম পটুয়া ইসমাইল। গত দশ বছর ধরে তিনি গড়ে আসছেন হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি। তাঁর বিশাল স্টুডিয়োয় চোখ রাখলেই নজরে পড়বে বিশালাকায় দুর্গা, অসুর, সরস্বতী, কার্তিক, লক্ষ্মী, গণেশ। কিন্তু এই বাংলাদেশে কি তিনি নির্ভয়ে শিল্পসৃষ্টির আনন্দ পান? নাকি পদে পদে ভয় তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে? শিল্পী জানাচ্ছেন, কথাটা ফেলে দেওয়ার নয়। প্রতি মুহূর্তে নিন্দা, ভর্ৎসনা এমনকী হুমকির মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। সহ্য করতে হয় টিটকিরি। কিন্তু সব প্রতিকূলতা তুচ্ছ করে তিনি হেঁটে চলেছেন সৃষ্টির পথে।

বাংলাদেশে ক্রমহ্রাসমান হিন্দু শিল্পরীতি নিয়ে কাজ করেন ঢাকার মিশু মিলন। যখনই খোঁজ পান কোনও শিল্পী সরা বা পট আঁকছেন তিনি চলে যান মুন্সিগঞ্জ, পারুলিয়া, টাঙাইল, বরিশাল। সেখানে শিল্পীদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তুলে ধরেন তাঁদের জীবন-সংগ্রামের কাহিনি। মিলনই খোঁজ পেয়েছেন প্রতিমা শিল্পী ইসমাইলের। তিনি জানাচ্ছেন, শিল্পীর তো কোনও ধর্ম হয় না। সৃষ্টি-সাধনাই তাঁর ধর্ম। তাঁর কথায়, “এ দেশে শিল্পীদের বিচরণক্ষেত্র ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। শিল্পীরা এখন বিপন্ন। একদিন হয়তো এই শিল্পীরা ও তাঁদের শিল্পকর্ম চিরতরে হারিয়ে যাবে।” একসময়ে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর থানা এলাকার জলিরপাড়ের কালীগঙ্গার পাড়ে দুর্গাপুজোর দশমীতে মেলা বসত। এলাকায় পরিচিতি ছিল জলিরপাড়ের আড়ং নামে। বহু দূর থেকে মানুষ নৌকা, ট্রলারে কালীগঙ্গায় আসত মেলা দেখতে। মেলায় প্রচুর মাটির পুতুল, লক্ষ্মীসরা, হাতি, ঘোড়া, টমটম গাড়ি সমেত মাটির সামগ্রী পাওয়া যেত। তবে এখনও সেই মেলা বসে কিনা তা জানা নেই অনেকেরই।

মৃৎশিল্পী ইসমাইলের ঠিকানা গোপন রাখতে চান মিলন। কেন? মিলন জানাচ্ছেন, হয়তো তাঁর এলাকায় বড় কিছু ঘটবে না কিন্তু, ঠিকানা জেনে গেলে বহিরাগতদের হামলার মুখে পড়তে পারেন ইসমাইল। সেই আশঙ্কায় যথেষ্ট জোর দেখতে পাচ্ছেন মিলন।পশ্চিমবঙ্গেও বহু মুসলিম মৃৎশিল্পী ও শিল্পানুরাগীর খোঁজ মেলে যাঁরা হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি, পট এঁকে চলেছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর ব্লকের নারাজোল গ্রামের মুসলিম পটুয়া ছোট দেবী মূর্তি গড়েন। সেই সব মিনিয়েচার মূর্তি ভিন রাজ্য তো বটে বিদেশেও যায়। ওই জেলারই কাঁসাই নদীর পারে পাথরা মন্দিরনগরী বাঁচিয়ে রাখার পিছনে প্রসংশনীয় ভূমিকা রয়েছে মহম্মদ ইয়াসিন পাঠানের। পিংলার পটশিল্পীদের সিংভাগই ধর্মে মুসলিম। কিন্তু, আজকের পরিবর্তিত বাংলাদেশে মণ্ডপের জন্য দুর্গা প্রতিমা গড়া একেবারে ব্যতিক্রমী ও সাহসী কাজ বলে মনে করছেন সে দেশের শিল্পরসিকেরা।